✍️ সম্পাদকের নোট
শুভ বৃহস্পতিবার! 👋
AgriNext Weekly (Vol. 14)-এ আপনাদের স্বাগতম। আজ ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬।
শীতের তীব্রতা থাকলেও আমাদের কৃষি কিন্তু থেমে নেই। বরং কুয়াশার চাদর ভেদ করে প্রযুক্তির ডানা মেলে তা এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে সেই প্রযুক্তি আর মাঠের সাফল্যের এক দারুণ মেলবন্ধন দিয়ে।
যেখানে একদিকে আমরা দেখছি ড্রোনের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্র মাত্র ৫ মিনিটে কীটনাশক ছিটিয়ে কৃষকের স্বাস্থ্য ও অর্থ বাঁচাচ্ছে, অন্যদিকে দেখছি সীতাকুণ্ডের শিম চাষিদের ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের স্বপ্ন।
এবারের সংখ্যায় আপনাদের জন্য বিশেষ যা থাকছে:
⛰️ গাইডলাইন: জমির উচ্চতা বুঝে সঠিক ফসল ও জাত নির্বাচনের উপায়।
🌾 অনুপ্রেরণা: একজন ভূমিহীন শ্রমিক থেকে ‘বীজ সুলতান’ হয়ে ওঠা রফিক আহমেদের গল্প।
🧪 কৌশল: লাউ-কুমড়োর ফলন বাড়াতে কৃত্রিম পরাগায়নের সহজ নিয়ম।
🏡 শখ: রান্নাঘরেই লেটুস ও ধনেপাতা চাষের টিপস।
কৃষি এখন আর শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং শৌখিনতার এক অপূর্ব সমন্বয়। আশা করি, আজকের আয়োজন আপনাদের সেই নতুন দিগন্তের সন্ধান দেবে।
সবার জন্য শুভকামনা।
ধন্যবাদান্তে,
মসরুর জুনাইদ সম্পাদক, AgriNext Weekly
🌟 এই সপ্তাহের হাইলাইট
⛰️ জমির উচ্চতা বুঝে সবজি চাষ: গাইডলাইন
সফল চাষাবাদে শুধু মাটি বা সার নয়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে জমির উচ্চতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চতাভেদে তাপমাত্রা বদলায়, যা ফলনকে প্রভাবিত করে। আপনার অঞ্চলের উচ্চতা অনুযায়ী উপযোগী ফসলের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. নিম্ন ভূমি (Lowland): < ৩০০ মিটার (বাংলাদেশের অধিকাংশ সমতল ভূমি)
উপযোগী ফসল: বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়স, শসা, করলা, তরমুজ, বাঙ্গি, মিষ্টি কুমড়া, ঝিঙা, লাউ, পেঁপে।
সতর্কতা (*): ক্যাপসিকাম ও টমেটোর ক্ষেত্রে জাত নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে।
২. মধ্যম ভূমি (Mid-land): ৩০০–১০০০ মিটার (সহনীয় তাপমাত্রার অঞ্চল)
উপযোগী ফসল: বাঁধাকপি, ফুলকপি, লেটুস, শিম এবং নিম্ন ভূমির প্রায় সব সবজি।
৩. উঁচু ভূমি (Highland): ১০০০–২৫০০ মিটার (পাহাড়ি ও অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা এলাকা)
উপযোগী ফসল: মটরশুঁটি, গাজর, আলু, ব্রোকলি, সালাদ টমেটো, ক্যাপসিকাম।
⚠️ বিশেষ সতর্কতা: তালিকায় যেসব ফসলের (যেমন: টমেটো, ফুলকপি, ক্যাপসিকাম) জাত উচ্চতা সংবেদনশীল, সেগুলোর ক্ষেত্রে সঠিক জাত (Variety) নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক। চাষের আগে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন। বিস্তারিত পড়ুন
📰 কৃষি খবর সংক্ষেপে
১. 🫘 সীতাকুণ্ডে শিমের রাজত্ব: ১০০ কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন সীতাকুণ্ড এখন ‘শিমের রাজ্য’। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বাম্পার ফলন হয়েছে, যা থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি বিক্রির আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় ৭টি জাতের (কার্তিকোটা, রূপবান, ছুরি, লইট্টা ইত্যাদি) শিম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন ইউরোপ-আমেরিকাতেও রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষত ‘রূপবান’ ও ‘ছুরি’ জাতের কারণে এখন সারা বছরই মিলছে শিম।
২. 🫑 ভোলাই কেন ‘ক্যাপসিকাম রাজধানী’—পরিসংখ্যানে চমক দেশে মোট ৩২৪ টন ক্যাপসিকাম উৎপাদনের মধ্যে ২৬২ টনই এসেছে ভোলা থেকে! চরাঞ্চলের পলিযুক্ত মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ভোলা এখন অঘোষিতভাবে ‘ক্যাপসিকামের রাজধানী’। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিলেটের উৎপাদন যেখানে মাত্র ১৫ টন, সেখানে ভোলার আধিপত্য একচ্ছত্র।
৩. 🌱 পলিনেট হাউজ: চারা উৎপাদনে আধুনিকতার ছোঁয়া জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে পলিনেট হাউজে উৎপাদিত রোগমুক্ত ও উন্নত মানের চারা কৃষকদের আস্থা অর্জন করেছে। আধুনিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে তৈরি এসব চারা (যেমন- গ্রিন বল বেগুন, মরিচ) রোপণ করে কৃষকরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। সনাতন পদ্ধতির বদলে প্রযুক্তির এই ছোঁয়ায় এলাকার কৃষিচিত্র বদলে যাচ্ছে।
🤖 Agri-Tech ফোকাস
ড্রোন প্রযুক্তি: ৫ মিনিটে কীটনাশক স্প্রে, খরচ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি—দুটোই অর্ধেক! 🚁
বাংলাদেশের কৃষিতে যুক্ত হয়েছে ‘যান্ত্রিক পাখি’ বা কৃষি ড্রোন। নরসিংদী ও মানিকগঞ্জের মাঠে এখন শ্রমিকের বদলে ড্রোন দিয়ে কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে, যা স্মার্ট কৃষির এক নতুন দিগন্ত।

ড্রোন বনাম সনাতন পদ্ধতি:
⏳ সময়ের জাদু: এক বিঘা জমিতে কীটনাশক দিতে শ্রমিকের লাগে ২ ঘণ্টা, ড্রোনে লাগে মাত্র ৩ থেকে ৫ মিনিট।
💰 খরচ সাশ্রয়: শ্রমিকের মজুরি যেখানে ৫০০–১০০০ টাকা, ড্রোনে খরচ মাত্র ২০০–৩০০ টাকা।
🛡️ স্বাস্থ্য সুরক্ষা: রিমোট কন্ট্রোলে স্প্রে করায় কৃষককে বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে হয় না, ফলে শ্বাসকষ্ট ও বিষক্রিয়ার ঝুঁকি কমে শূন্যের কোঠায়।
কারা করছে? ‘জিনিয়াস ফার্মস’ ও ‘ফ্লাইমেক’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেশেই ড্রোন সংযোজন করছে। জিপিএস নিয়ন্ত্রিত এই ড্রোনগুলো জমির প্রতিটি কোণায় নিখুঁতভাবে ওষুধ ছিটায়, ফলে অপচয়ও কমে।
ভবিষ্যৎ: এটি গ্রামীণ তরুণদের জন্য ‘ড্রোন পাইলট’ হিসেবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, শ্রমিকের সংকট কাটাতে হারভেস্টারের পর ড্রোনই হবে কৃষকের সেরা বন্ধু। বিস্তারিত পড়ুন
🧪 ইনপুট আপডেট
লাউ-কুমড়োর কৃত্রিম পরাগায়ন: ফল ঝরা রোধ ও বাম্পার ফলনের গ্যারান্টি! 🌼
লাউ বা কুমড়ো গাছে প্রচুর জালি আসছে কিন্তু বড় না হয়েই পচে ঝরে যাচ্ছে? এর প্রধান কারণ পরাগায়নের অভাব। এই সবজিতে একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদাভাবে ফোটে, তাই অনেক সময় মৌমাছি বা প্রাকৃতিকভাবে পরাগায়ন না হলে ফলন হয় না।
সমাধান: কৃত্রিম বা হাত পরাগায়ন প্রাকৃতিক পরাগায়নের ভরসায় না থেকে নিজেই পরাগায়ন করে দিলে ফলন নিশ্চিত করা যায়।
পদ্ধতি: ১. ফুল নির্বাচন: সকালে ফুল ফোটার পর তাজা পুরুষ ফুলটি ছিঁড়ে নিন। ২. প্রস্তুতি: পুরুষ ফুলের পাপড়িগুলো সাবধানে ছিঁড়ে ফেলে শুধু পরাগধানী (রেণুযুক্ত দণ্ড) বের করুন। ৩. পরাগায়ন: এবার পরাগধানীটি গাছে থাকা স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে (মাঝখানের অংশ) আলতো করে ঘষে দিন বা টোকা দিন।
উপকারিতা:
কচি ফল শুকিয়ে যাওয়া বা ঝরে পড়া বন্ধ হয়।
ফলের আকার সুঠাম ও সুন্দর হয়।
ফলন ও বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়।
👩🌾 উদ্যোক্তার গল্প
🌾 শ্রমিক থেকে ‘বীজ সুলতান’: ভূমিহীন রফিকের কৃষি বিপ্লব!
নিজের এক শতাংশ জমি নেই, অথচ তিনি ফলান সোনা! কুমিল্লার দেবীদ্বারের কাবিলপুর গ্রামের রফিক আহমেদ আজ এক নামেই পরিচিত—‘বীজ সুলতান’।
শূন্য থেকে শিখরে: একসময়ের জুট মিলের শ্রমিক রফিক ২০০৪ সালে কৃষি অফিসারের দেওয়া মাত্র ২ কেজি বীজ দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। সেই ২ কেজির যাত্রা আজ পৌঁছেছে ১৬ টনে। বর্তমানে ৬ একর জমি বর্গা নিয়ে তিনি বছরে ১৬ টন ধানের বীজ উৎপাদন করছেন।
কৃষি বিভাগের আস্থা: শুধু উৎপাদন নয়, কৃষি বিভাগের প্রায় ৫০০ জাতের নতুন ধানের পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে তার হাতেই। কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে তিনি এক আস্থার প্রতীক। তার উৎপাদিত বীজ স্থানীয় কৃষক তো বটেই, যাচ্ছে দেশের বড় বড় বীজ কোম্পানির কাছেও।
স্বপ্ন: দারিদ্র্য ও অনাহারকে জয় করা রফিকের একটাই কথা, “ক্ষুধার যন্ত্রণা আমাকে এত দূর এনেছে। তাই আমৃত্যু দেশের মানুষের ক্ষুধা নিবারণের কাজ করে যেতে চাই।”
🏡 ছাদবাগান ও ইনডোর কর্নার
🥗 শীতে রান্নাঘরেই ফলান তাজা লেটুস ও ধনেপাতা!
শীতের বার্গার-সালাদে লেটুস আর তরকারিতে ধনেপাতা ছাড়া যেন চলেই না! বাজারের বাসি পাতার বদলে রান্নাঘরের এক চিলতে জায়গায় বা জানালার তাকেই চাষ করুন এই দুই ফসল।
চাষ পদ্ধতি:
পাত্র: ছোট টব, প্লাস্টিকের বোতল বা ট্রে ব্যবহার করতে পারেন। নিচে পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র থাকা জরুরি।
আলো: কড়া রোদের প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত রোদে লেটুস তিতকুটে হয়, তাই জানালার আংশিক আলো বা ছায়াই এদের জন্য যথেষ্ট।
মাটি: দোআঁশ মাটির সাথে পরিমাণমতো গোবর বা কম্পোস্ট সার মিশিয়ে নিন।
সেচ: মাটি সবসময় ভেজা রাখবেন, তবে গোড়ায় যেন পানি না জমে।
💡 স্মার্ট টিপস: ফসল তোলার সময় ‘কাট অ্যান্ড কাম এগেইন’ (Cut & Come Again) পদ্ধতি ব্যবহার করুন। অর্থাৎ, পুরো গাছ না তুলে শুধু বাইরের বড় পাতাগুলো ছিঁড়ে নিন। এতে ভেতর থেকে নতুন পাতা গজাবে এবং দীর্ঘদিন ফলন পাবেন। বিস্তারিত জানুন
📩 আপনার প্রশ্ন ও মতামত
কৃষি বা কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে আপনার মনে কি কোনো প্রশ্ন আছে? আপনার সমস্যা বা মতামত আমাদের জানান। নির্বাচিত প্রশ্নগুলো পরের সংখ্যায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শসহ প্রকাশিত হবে।
✍️ আপনার প্রশ্ন পাঠান: [email protected]
🙌 শেষ কথা
ধন্যবাদ আমাদের সাথে থাকার জন্য!
পরের বৃহস্পতিবার নতুন আপডেট নিয়ে আবার আসছি 🚀
📩 [পূর্ববর্তী ইস্যুগুলো পড়ুন] | 🌱 [আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন] | 🤝 [শেয়ার করুন]

